তালাকের পর স্ত্রী ভরণপোষণ পাবেন কি

তালাকের পর স্ত্রী ভরণপোষণ পাবেন কি? বাংলাদেশি আইনে সঠিক নিয়ম

বাংলাদেশে পরিবার, বিবাহ এবং তালাক সংক্রান্ত আইনি প্রশ্নগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয় হলো তালাকের পর স্ত্রী ভরণপোষণ (Maintenance) পাবেন কি না। বিশেষ করে মুসলিম পারিবারিক আইনের আওতায় তালাক হলে স্ত্রী কতদিন এবং কোন ভিত্তিতে ভরণপোষণ দাবি করতে পারবেন, এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা বিভ্রান্তি, ভুল ব্যাখ্যা ও প্রচলিত ধারণা রয়েছে।

আমাদের সমাজে তালাক শুধু একটি সম্পর্কের সমাপ্তি নয়; এটি স্ত্রী, সন্তান এবং উভয় পরিবারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। অনেক সময় তালাকপ্রাপ্ত নারীরা আর্থিক সংকটে পড়েন, যা তাদের মৌলিক জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা এবং সামাজিক অবস্থানকে সরাসরি প্রভাবিত করে। তাই তালাকের পর ভরণপোষণ পাওয়া নারীর আইনি অধিকার সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, আদালতের রায় এবং বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী, তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর ভরণপোষণ পাওয়ার বিষয়টি বিশেষ শর্ত, পরিস্থিতি ও সময়সীমার ওপর নির্ভরশীল। অনেকেই ধারণা করেন যে তালাকের পর আর ভরণপোষণ দাবি করা যায় না; আবার অনেকেই মনে করেন দীর্ঘমেয়াদে স্ত্রী ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন। আসলে কোন ধারণাটি সঠিক?

এই আর্টিকেলটি সেই সকল প্রশ্নের স্পষ্ট, আইনি ভিত্তিক ও সহজবোধ্য উত্তর দেবে।
যাতে একজন সাধারণ পাঠকও বুঝতে পারেন:

  • তালাকের পর কোন পরিস্থিতিতে স্ত্রী ভরণপোষণ পাবেন
  • কতদিন পর্যন্ত ভরণপোষণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে
  • আদালত কীভাবে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়
  • এবং স্ত্রী কীভাবে আইনগতভাবে ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন

বাংলাদেশে তালাকের পর স্ত্রী ভরণপোষণ পাওয়ার আইনি ভিত্তি

তালাকের পর স্ত্রী ভরণপোষণ দাবি করতে পারবেন কি না, এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন, পারিবারিক আদালত আইনের বিধান এবং আদালতের ব্যাখ্যার ওপর। নিচে এসব আইনি কাঠামো সহজভাবে তুলে ধরা হলো।

 মুসলিম পারিবারিক আইন (Muslim Family Laws Ordinance, 1961)

এই আইনের অধীনে তালাকের কার্যকর হওয়া এবং নারীর অধিকার সম্পর্কিত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে, তবে আইনটি “তালাক-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি ভরণপোষণ” সম্পর্কে সরাসরি নির্দেশ দেয় না।
তবে এটি বলে:

  • তালাক কার্যকর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত স্ত্রী বৈধ ভরণপোষণের অধিকারী।
  • তালাকের নোটিশ প্রদান এবং কার্যকর হওয়ার মধ্যবর্তী সময় (প্রায় ৯০ দিন) স্বামী ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।

ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ (Iddat Maintenance)

ইসলামিক শরিয়া এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের ব্যাখ্যায় স্বামী তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে ইদ্দতকাল পর্যন্ত ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।

  • ইদ্দতের মেয়াদ সাধারণত তিন মাস (প্রায় ৯০–100 দিন)
  • এই সময় স্ত্রীকে খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক ভরণপোষণ স্বামীকে বহন করতে হবে।
  • ইদ্দতের সময় স্ত্রী গর্ভবতী হলে, ইদ্দত চলে সন্তানের জন্ম পর্যন্ত। এসময় ভরণপোষণ বাধ্যতামূলক।

এটি শরিয়া এবং দেশের প্রচলিত আইনে স্পষ্টভাবে স্বীকৃত।

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী বিধান

বাংলাদেশের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন প্রধানত হানাফি মাজহাব অনুসরণ করে।
হানাফি আইনে:

  • তালাকের পর স্ত্রী স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি ভরণপোষণের অধিকারী নন,
  • শুধুমাত্র ইদ্দতকাল পর্যন্তই ভরণপোষণ প্রযোজ্য।

পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, 1985

বাংলাদেশে পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এই আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই আইনে ভরণপোষণ দাবি করার ক্ষমতা (maintenance suit) স্পষ্টভাবে দেয়া আছে।
তবে আদালত সাধারণত নিচের বিষয় বিচার করে:

  • তালাকের পর কতদিন পর্যন্ত ভরণপোষণ প্রযোজ্য
  • স্ত্রী কি নিজে উপার্জন করতে সক্ষম?
  • স্বামীর অর্থনৈতিক অবস্থা
  • সন্তানের উপস্থিতি আছে কি না

পারিবারিক আদালত “তালাক-পরবর্তী ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ”,ইসলামি আইন অনুসারে আদেশ দিতে পারে।

১৯৯৫ সালের বিখ্যাত মামলা: দেয়ারা বেগম মামলা (Appellate Division)

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (Appellate Division) একাধিক রায়ে ব্যাখ্যা করেছে:

  • তালাকের পর স্ত্রী ইদ্দতকাল পর্যন্তই ভরণপোষণের অধিকারী।
  • স্থায়ী বা আজীবন ভরণপোষণ ইসলামী আইন বা দেশের প্রচলিত আইনে নেই।

এটি বাংলাদেশের ভরণপোষণ আইনের চূড়ান্ত নীতি হিসেবে বিবেচিত।

মাতা-পিতার সম্পদের বণ্টন বা তালাক-পরবর্তী আর্থিক ক্ষতিপূরণ

বাংলাদেশে তালাক-পরবর্তী “মন্তব্যী ক্ষতিপূরণ (alimony)” বা “property division” এর মতো বিধান নেই।
তাই স্থায়ী আর্থিক সহায়তা বা সম্পত্তি বিভাজন স্বামী বাধ্যতামূলকভাবে দিতে বাধ্য নয় (যদি কাবিননামায় উল্লেখ না থাকে)।

মাতা-পিতার সম্পদের বণ্টন বা তালাক-পরবর্তী আর্থিক ক্ষতিপূরণ

সংক্ষেপে আইনের সারমর্ম

বিষয়আইন কী বলে
তালাক চলাকালীন ভরণপোষণবাধ্যতামূলক
ইদ্দতকালীন ভরণপোষণবাধ্যতামূলক
তালাকের পর, ইদ্দতের পর ভরণপোষণসাধারণত প্রযোজ্য নয়
কাবিনে উল্লেখ থাকলেপৃথকভাবে দাবি করা যায়
গর্ভবতী স্ত্রীসন্তানের জন্ম পর্যন্ত ভরণপোষণ দিতে হবে

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় তালাক-পরবর্তী ভরণপোষণ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ

তালাকের পর স্ত্রী ভরণপোষণ দাবি করতে পারবেন কি না, এ বিষয়ে বাংলাদেশে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য মামলা ও আদালতের ব্যাখ্যা রয়েছে। নিচে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণগুলোর সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো।

দেয়ারা বেগম মামলা (1995, Appellate Division)

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়কে তালাক-পরবর্তী ভরণপোষণ বিষয়ে “leading case” বলা হয়।
রায়ের মূল বক্তব্য:

  • তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী শুধুমাত্র ইদ্দতকাল পর্যন্ত ভরণপোষণের অধিকারী।
  • ইদ্দতের পর স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি ভরণপোষণ ইসলামী আইন বা বাংলাদেশি আইনে বাধ্যতামূলক নয়।
  • শরিয়ার বিধান অনুসারেই বাংলাদেশে ভরণপোষণ নির্ধারণ করা হবে।

এই রায় দেশে তালাক-পরবর্তী ভরণপোষণের চূড়ান্ত অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

কাবিননামায় উল্লেখ থাকলে ভরণপোষণের অধিকার বাড়তে পারে

যেসব ক্ষেত্রে কাবিননামায় অতিরিক্ত ভরণপোষণ, ক্ষতিপূরণ বা বসতবাড়ির ব্যবস্থা সংক্রান্ত বিশেষ শর্ত থাকে:
আদালত সেই শর্ত অনুযায়ী স্ত্রীকে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা দিতে স্বামীকে বাধ্য করতে পারে।
এটি সম্পূর্ণভাবে চুক্তিভিত্তিক (contractual obligation)।

উদাহরণ: এক মামলায় দেখা যায়, কাবিননামায় উল্লেখ ছিল—তালাক হলে স্ত্রীকে ৫ লাখ টাকা প্রদান করতে হবে। আদালত কাবিননামাকে চুক্তি হিসেবে গণ্য করে সেই টাকা প্রদানের আদেশ দেয়।

ইদ্দত চলাকালে স্ত্রীকে বাসস্থান থেকে বের করে দিলে আদালতের কঠোর অবস্থান

আদালত বারবার বলেছেন:

  • ইদ্দতের সময় স্ত্রীকে বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা দেওয়া স্বামীর বাধ্যবাধকতা।
  • এই সময় তাকে বাসা থেকে বের করে দেয়া অবৈধ এবং আদালত এতে ক্ষতিপূরণও ধার্য করতে পারেন।

একাধিক পারিবারিক আদালতের রায়ে ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ (৯০–১০০ দিনের ব্যয়) এককালীনভাবে প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে বিবাহ বিচ্ছেদ (তালাক) এর আইন ও প্রক্রিয়া, এ বিষয়ে আমাদের Law Doors ওয়েবসাইটে বিস্তারিত একটি নিবন্ধ রয়েছে, প্রয়োজন হলে পরে দেখে নিতে পারেন।

গর্ভবতী তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর ভরণপোষণ

বাংলাদেশের আদালত শরিয়া অনুযায়ী নিয়মিত ব্যাখ্যা দেয়:

  • যদি তালাকের সময় স্ত্রী গর্ভবতী হন, তবে ইদ্দত চলবে সন্তানের জন্ম পর্যন্ত।
  • স্বামী সেই entire period–এর ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।

এটি Bangladeshi Family Court–গুলোতে প্রতিষ্ঠিত নীতি।

 সন্তানের ভরণপোষণ সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়

অনেক সময় মানুষ মনে করেন স্ত্রী ভরণপোষণ না পেলে সন্তানও পাবে না।
এ ধারণা ভুল।
আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি হলো:

  • সন্তানের maintenance পাওয়ার অধিকার স্থায়ী এবং অব্যাহত,
  • তালাক এই অধিকারকে কোনোভাবেই বাতিল করতে পারে না।

সন্তানের খরচ আলাদা করে Father-কে দিতে হবে (education, food, medical ইত্যাদি)।

সংক্ষেপে আদালতের অবস্থান

  • ইদ্দতের সময় ভরণপোষণ অবশ্যই দিতে হবে।
  • ইদ্দতের পর বাধ্যতামূলক ভরণপোষণ নেই, কেবল কাবিনের শর্ত থাকলে পাওয়া যায়।
  • গর্ভবতী স্ত্রীর ক্ষেত্রে সন্তানের জন্ম পর্যন্ত ভরণপোষণ বাধ্যতামূলক।
  • সন্তানের ভরণপোষণ পৃথক ও দীর্ঘমেয়াদি অধিকার।

তালাকের পর ভরণপোষণ দাবি করতে চাইলে কী করবেন? — আইন অনুযায়ী করণীয় পদক্ষেপ

তালাকের পর ভরণপোষণ সম্পর্কিত অধিকার ও করণীয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষ অনেক সময় সঠিক দিকনির্দেশনা পান না। এখানে সহজ ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ করণীয় বিষয়সমূহ তুলে ধরা হলো।

 ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ দাবি করা (Mandatory Maintenance)

তালাক কার্যকর হওয়ার পর স্ত্রী ইদ্দতের সময় ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার রাখেন।
করণীয়:

  • স্বামীর কাছে মৌখিক বা লিখিতভাবে ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ দাবি করা যেতে পারে।
  • স্বামী দিতে অস্বীকার করলে পারিবারিক আদালতে (Family Court) মামলা করা যাবে।

প্রমাণ হিসেবে লাগবে:

  • তালাকনামার কপি
  • নিকাহনামা/কাবিননামা
  • তালাকের নোটিশ গ্রহণের কপি

 কাবিননামায় উল্লেখ থাকলে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা দাবি

যদি কাবিননামায় তালাকের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ বা অতিরিক্ত ভরণপোষণের বিধান থাকে, তাহলে তা আইনি চুক্তি হিসেবে গণ্য হবে।
করণীয়:

  • কাবিননামার শর্ত দেখুন।

স্বামী শর্ত পালন না করলে চুক্তিভিত্তিক দাবি করে আদালতে মামলা করা সম্ভব।

 গর্ভবতী তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর বিশেষ অধিকার

যদি স্ত্রী তালাকের সময় গর্ভবতী হন:

  • ইদ্দত চলবে সন্তানের জন্ম পর্যন্ত।
  • এসমস্ত খরচ সম্পূর্ণরূপে স্বামী দিতে বাধ্য।

করণীয়:

  • মেডিকেল রিপোর্ট বা প্রেগন্যান্সির প্রমাণ রাখুন।
  • প্রয়োজনে Family Court–এ জরুরি আবেদন করে ভরণপোষণ আদায় করা যায়।

সন্তানের ভরণপোষণ দাবি (Separate & Long-term Right)

স্ত্রীর ভরণপোষণ শেষ হলেও সন্তানের ভরণপোষণের অধিকার স্থায়ী
করণীয়:

  • সন্তানের সব খরচ হিসেব করে মাসিক ভরণপোষণের জন্য স্বামীর কাছে দাবি তুলুন।
  • না দিলে Family Court–এ maintenance suit দাখিল করুন।

প্রমাণ হিসেবে শিশুর স্কুল ফি, মেডিকেল বিল, খাবার খরচ ইত্যাদি সংযুক্ত করুন।

 তালাকের নোটিশের বৈধতা নিশ্চিত করা

অনেক সময় তালাক সঠিকভাবে সম্পন্ন না হওয়ায় ভরণপোষণ দাবি জটিল হয়।
করণীয়:

  • তালাকের নোটিশ ইউনিয়ন কাউন্সিল বা সিটি করপোরেশনে সঠিকভাবে পাঠানো হয়েছে কি না নিশ্চিত করুন।

রেজিস্টার্ড কপি সংগ্রহ করে রাখুন।

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR / সালিশ)

কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক বিরোধ মীমাংসার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।
করণীয়:

  • উভয় পক্ষ চাইলে সালিশ বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে ভরণপোষণ ও অন্যান্য বিষয় নির্ধারণ করা যায়।
  • তবে চুক্তিটি লিখিত হওয়া জরুরি।

 অ্যাডভোকেটের পরামর্শ নেওয়া

ভরণপোষণ দাবি সম্পর্কিত অনেক বিষয় কেসভেদে ভিন্ন হতে পারে।
একজন অভিজ্ঞ ফ্যামিলি ম্যাটার অ্যাডভোকেটের পরামর্শ নিলে মামলা দ্রুত ও সঠিকভাবে এগিয়ে যায়।

সংক্ষেপে করণীয়

পরিস্থিতিকরণীয়
সাধারণ তালাকইদ্দতকালীন ভরণপোষণ দাবি
কাবিনে শর্ত থাকলেঅতিরিক্ত সুবিধা দাবি
স্ত্রী গর্ভবতীসন্তানের জন্ম পর্যন্ত ভরণপোষণ
স্ত্রী ভরণপোষণ শেষ হলেও সন্তান আছেসন্তানের long-term maintenance
স্বামী ভরণপোষণ না দিলেFamily Court–এ মামলা

তালাকের পর স্ত্রী ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন কি না — সাধারণ নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর

তালাকের পর স্ত্রী কি ভরণপোষণ পাবেন?

উত্তর: হ্যাঁ, কিন্তু শুধুমাত্র ইদ্দতকাল পর্যন্ত। ইদ্দতের সময় স্বামী ভরণপোষণ দেওয়া বাধ্যতামূলক।

ইদ্দত কতদিন হয় এবং এই সময় কী কী ভরণপোষণ পাওয়া যায়?

উত্তর: সাধারণত তিন মাস (প্রায় ৯০–১০০ দিন)। এই সময়ে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা,সমস্ত মৌলিক খরচ স্বামীকে বহন করতে হবে।

ইদ্দতের পর কি স্ত্রী দীর্ঘমেয়াদি ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন?

উত্তর: সাধারণত না। বাংলাদেশে তালাক-পরবর্তী স্থায়ী ভরণপোষণের বিধান নেই, তবে কাবিননামায় বিশেষ শর্ত থাকলে তা দাবি করা যায়।

তালাকের সময় স্ত্রী যদি গর্ভবতী থাকেন তখন কী হবে?

উত্তর: স্বামী গর্ভবতী স্ত্রীর ভরণপোষণ সন্তানের জন্ম পর্যন্ত দিতে বাধ্য। এটি শরিয়া ও বাংলাদেশি আইনে স্পষ্টভাবে স্বীকৃত।

সন্তানের ভরণপোষণ কি তালাকের পরেও স্বামী দিতে বাধ্য?

উত্তর: হ্যাঁ। সন্তানের ভরণপোষণ স্বতন্ত্র ও দীর্ঘমেয়াদি অধিকার। তালাক এ দায়িত্ব বাতিল করতে পারে না।

স্বামী যদি ইদ্দত ভরণপোষণ না দেন তাহলে কী করা উচিত?

উত্তর: নোটিশ বা মৌখিকভাবে দাবি করার পরেও না দিলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে (Family Court) ভরণপোষণ মামলা করতে পারেন।

কাবিনে উল্লেখিত টাকা কি ভরণপোষণ হিসেবে পাওয়া যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, কাবিনে যদি তালাক-পরবর্তী আর্থিক সুবিধা বা ক্ষতিপূরণের শর্ত থাকে, আদালত সেই চুক্তি বাস্তবায়নের নির্দেশ দিতে পারে।

ইদ্দতের সময় কি স্ত্রী স্বামীর বাসায়ই থাকতে হবে?

উত্তর: আইন ও শরিয়ার দৃষ্টিতে ইদ্দতের সময় স্ত্রীকে বাসস্থান দেওয়া স্বামীর দায়িত্ব, তাই তাকে বাসা থেকে বের করে দেয়া বেআইনি।

তালাকের পর যদি স্ত্রী কাজ করেন বা উপার্জন থাকে তবে কি ভরণপোষণ পাবেন?

উত্তর: ইদ্দত ভরণপোষণ অবশ্যই পাবেন, কারণ এটি নারী, পুরুষের আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে না।

ভরণপোষণের মামলা করতে কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন?

উত্তর:

  • তালাকনামা
  • কাবিননামা
  • তালাক নোটিশের কপি
  • স্বামীর আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ (সম্ভব হলে)

উপসংহার 

তালাকের পর ভরণপোষণের অধিকার—আইন যা বলে তার স্পষ্ট সারসংক্ষেপ

বাংলাদেশে তালাক-পরবর্তী ভরণপোষণ নিয়ে সমাজে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, তালাক দিলেই স্ত্রী দীর্ঘমেয়াদি ভরণপোষণ পাবেন, আবার কেউ কেউ মনে করেন তালাকের পর কোনো ভরণপোষণই নেই। বাস্তবে, আইন একটি সুস্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট পথ নির্ধারণ করেছে।

বাংলাদেশের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন, প্রচলিত আদালতের রায় এবং Family Court আইন অনুযায়ী:

  • তালাকের পর স্ত্রী ইদ্দতকাল পর্যন্ত ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার রাখেন, এটি বাধ্যতামূলক এবং অস্বীকারযোগ্য নয়।
  • ইদ্দতের পর স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি ভরণপোষণ দেশে স্বীকৃত নয়, তবে কাবিননামায় বিশেষ শর্ত উল্লেখ থাকলে স্ত্রী আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন।
  • গর্ভবতী তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী সন্তানের জন্ম পর্যন্ত ভরণপোষণ দাবি করতে পারবেন।
  • সন্তানের ভরণপোষণ তালাকের দ্বারা কোনোভাবেই বন্ধ হয় না,এটি দীর্ঘমেয়াদি ও নিশ্চিত অধিকার।

সুতরাং, একজন নারী তালাকপ্রাপ্ত হলে তার প্রথম করণীয় হলো, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ দাবি করা, কাবিনের শর্ত পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে পারিবারিক আদালতের সহায়তা নেওয়া। আইন তার পাশে আছে, তবে অধিকার আদায়ের জন্য সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়া জরুরি।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *