সালিশি বোর্ড কীভাবে কাজ করে?

সালিশি বোর্ড কীভাবে কাজ করে? | Arbitration in Bangladesh | সম্পূর্ণ আইনগত গাইড

বাংলাদেশের গ্রামীণ ও নগর সামাজিক ব্যবস্থায় বিরোধ মীমাংসার একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত পদ্ধতি হলো সালিশি বোর্ড বা Arbitration। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নানা ধরনের বিরোধ, জমি-জমা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়িক চুক্তি ভঙ্গ, দেনা-পাওনা, ক্ষতিপূরণ,এসব সমস্যার সমাধান আদালতের মাধ্যমে করা যায় বটে, কিন্তু সে প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং মানসিক চাপপূর্ণ। ঠিক এই জায়গায় সালিশি বোর্ড একটি দ্রুত, সহজ, কম খরচে বিরোধ নিষ্পত্তির বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের আইন এবং সামাজিক রীতি,উভয় ক্ষেত্রেই সালিশি একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। শহর এলাকায় এটি সাধারণত ব্যবসায়িক চুক্তি বা Commercial dispute-এ ব্যবহৃত হলেও গ্রামাঞ্চলে স্থানীয় সমস্যা সমাধানেও সালিশি বোর্ড ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। Arbitration-এর অন্যতম বিশেষত্ব হলো:

  • বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি,
  • গোপনীয়তা বজায় থাকে,
  • উভয় পক্ষের সম্মতিতে নিরপেক্ষ সালিশকারী,

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আদালতের বাইরে শান্তিপূর্ণ সমাধান।

সাম্প্রতিককালে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, নির্মাণকাজ, বিনিয়োগ, কনট্রাক্ট ইত্যাদি ক্ষেত্রে সালিশির ব্যবহার আরও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চুক্তিপত্রে আগেই উল্লেখ থাকে যে কোনো বিরোধ হলে সালিশির মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি করা হবে। ফলে আদালতের উপর চাপ কমে এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক অটুট থাকে।

এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত জানব,বাংলাদেশে সালিশি বোর্ড কীভাবে কাজ করে, কোন আইনে এর ভিত্তি, কীভাবে সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, কোন পরিস্থিতিতে সালিশি গ্রহণযোগ্য অথবা চ্যালেঞ্জ করা যায়,এবং একজন সাধারণ নাগরিক কীভাবে এ প্রক্রিয়ায় সঠিকভাবে পদক্ষেপ নেবে।

বাংলাদেশে সালিশি বোর্ড (Arbitration) পরিচালনার আইনগত ভিত্তি

বাংলাদেশে সালিশির পুরো কাঠামো মূলত Arbitration Act, 2001 (সালিশি আইন, ২০০১) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই আইন আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ব্যবসায়িক বিরোধসহ অন্যান্য বেসরকারি বিরোধ দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি করা যায়।

 সালিশি আইনের উদ্দেশ্য

সালিশি আইন, ২০০১ এর প্রধান লক্ষ্য হলো:

  • আদালতের বাইরে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মতভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি করা,
  • পক্ষদ্বয়ের সম্মতিতে সালিশকারী নিয়োগ,

সালিশি রায় (Arbitral Award) কে আদালতের রায়ের মতো কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করা।

আদালতে মামলা ফাইল করার খরচ ও প্রক্রিয়া, এ বিষয়ে আমাদের Law Doors ওয়েবসাইটে বিস্তারিত একটি নিবন্ধ রয়েছে, প্রয়োজন হলে পরে দেখে নিতে পারেন।

 কোন বিষয়ে সালিশি করা যায়?

Arbitration Act, 2001 অনুযায়ী যেকোনো দেওয়ানি বা ব্যবসায়িক বিরোধ, যার সমাধান আইনত নিষিদ্ধ নয়, সালিশির আওতায় আনা যায়। যেমন:

  • চুক্তিভঙ্গ সংক্রান্ত বিরোধ
  • নির্মাণ বা বাণিজ্যিক চুক্তির বিবাদ
  • দেনা-পাওনা
  • সম্পত্তি বা ব্যবসা সংক্রান্ত লেনদেন

সেবা প্রদান/গ্রহণ নিয়ে বিরোধ

 কিন্তু নিম্নলিখিত বিষয়ে সালিশি করা যায় না:

  • ফৌজদারি মামলা
  • পারিবারিক আইন (তালাক, ভরণপোষণ ইত্যাদি আদালতনির্ভর বিষয়)
  • দেউলিয়া, কর, ভূমি অধিগ্রহণ, শ্রম আইনের কিছু বিশেষ বিষয়

জনস্বার্থ বা জননিরাপত্তা সম্পর্কিত বিষয়

 সালিশি চুক্তি (Arbitration Agreement) – আইনের মূল শর্ত

Arbitration Act, 2001 এর ধারা ১০ অনুযায়ী সালিশির জন্য একটি লিখিত সালিশি চুক্তি প্রয়োজন। এই চুক্তি হতে পারে:

  • চুক্তিপত্রের অংশ হিসেবে (Arbitration Clause), বা
  • বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার পর আলাদা লিখিত চুক্তি হিসেবে

এতে উল্লেখ থাকে:

  • সালিশকারী কে হবেন/কিভাবে নির্বাচন করা হবে
  • সালিশির স্থান, নিয়ম, মেয়াদ
  • কোন ধরনের বিরোধ সালিশির আওতায় আসবে

সালিশকারী নিয়োগ (Section 11–12)

সালিশকারী (Arbitrator) নির্বাচন হয় পক্ষদ্বয়ের সম্মতিতে। এটি হতে পারে:

  • একজন সালিশকারী
  • তিনজন সালিশকারী (তিনজনের বোর্ড)
  • প্রাতিষ্ঠানিক সালিশি প্রতিষ্ঠান (যেমন: BIAC – Bangladesh International Arbitration Centre)

যদি উভয় পক্ষ সালিশকারী ঠিক করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আদালত (District Judge) সালিশকারী নিয়োগ করতে পারে।

সালিশি প্রক্রিয়া (Sections 18–29)

আইন অনুযায়ী সালিশি বোর্ড:

  • উভয় পক্ষকে নোটিশ দেয়,
  • শুনানি চালায়,
  • প্রমাণ/দলিল গ্রহণ করে,
  • প্রয়োজনে সাক্ষ্যগ্রহণ পরিচালনা করে,
  • এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত প্রদান করে।

সালিশি প্রক্রিয়াটি আদালতের আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অনেক সহজ ও নমনীয়।

 সালিশি রায় (Arbitral Award) – Section 38

সালিশি বোর্ড সিদ্ধান্ত দিলে সেটিকে বলা হয় Arbitral Award, যা কার্যত আদালতের দেওয়ানি ডিক্রির মতো শক্তিশালী।
এ রায়ের বৈশিষ্ট্য:

  • লিখিত হতে হবে
  • সালিশকারীর স্বাক্ষর থাকতে হবে
  • সিদ্ধান্তের কারণ উল্লেখ থাকতে পারে

উভয় পক্ষকে সরবরাহ করতে হবে

 সালিশি রায় কার্যকর (Enforcement) – Section 44

আদালতের ডিক্রির মতোই সালিশি রায় কার্যকর হয়। যদি কেউ মানতে অস্বীকার করে, অন্য পক্ষ আদালতে রায়ের কার্যকরীর আবেদন করতে পারে।

 সালিশি রায় চ্যালেঞ্জ (Section 42)

সালিশি রায় পুরোপুরি অচ্যালেঞ্জযোগ্য নয়। নিম্নলিখিত কারণে আদালতে রায় বাতিলের আবেদন করা যায়:

  • সালিশি চুক্তি অবৈধ
  • সালিশকারী পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন
  • যথাযথ নোটিশ দেওয়া হয়নি
  • কর্তৃত্বের বাইরে গিয়ে রায় দেওয়া হয়েছে
  • প্রাকৃতিক ন্যায়ের নীতি লঙ্ঘন

তবে শুধু রায় পছন্দ হয়নি, এই কারণে রায় বাতিল করা যায় না।

সালিশি বোর্ড (Arbitration) নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিচারিক অবস্থান

সালিশি বোর্ড (Arbitration) নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিচারিক অবস্থান

বাংলাদেশে সালিশি প্রক্রিয়া শুধু তাত্ত্বিক নয়, প্রাত্যহিক ব্যবসায়িক, দেওয়ানি ও চুক্তিভিত্তিক সম্পর্কগুলোতে সালিশির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আদালতও সাধারণত সালিশিতে পক্ষদ্বয়ের স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্তকে সম্মান করে।

 বাস্তব উদাহরণ – বাণিজ্যিক চুক্তিভঙ্গ মামলা

ধরা যাক, একটি নির্মাণ কোম্পানি (“Company A”) এবং একজন কনট্রাক্টরের (“Company B”) মধ্যে চুক্তি হয়। চুক্তির শেষে কাজের মান নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে A সালিশিতে যেতে চায়, কারণ চুক্তিপত্রে Arbitration Clause ছিল।

কি হলো?

  • উভয় পক্ষ চুক্তিতে উল্লেখিত সালিশী প্রতিষ্ঠানে আবেদন করল।
  • সালিশকারী নিয়োগ হলো তিনজনের বোর্ড হিসেবে।
  • উভয় পক্ষ প্রমাণ উপস্থাপন করল।
  • সালিশি বোর্ড সিদ্ধান্ত দিল: কাজের কিছু অংশ অমানক হওয়ায় B কে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

এই সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক হয়ে গেল এবং আদালত এতে হস্তক্ষেপ করল না। এই ধরনের ব্যবসায়িক বিরোধ arbitration-এর মাধ্যমে দ্রুত সমাধান হওয়া একটি সাধারণ উদাহরণ।

বাস্তব উদাহরণ – দেনা-পাওনা সংক্রান্ত বিরোধ

একজন ব্যবসায়ী অন্য এক ব্যক্তির কাছ থেকে পণ্য কিনে বকেয়া পরিশোধ করেননি। চুক্তিতে সালিশি ধারা ছিল। আদালতে মামলা না করে সালিশে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়। সালিশকারী প্রমাণের ভিত্তিতে দেনা পরিশোধের নির্দেশ দেন।

এই ধরনের ছোট-বড় দেনাপাওনা বিরোধ সালিশির মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।

 বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি – আদালতের মূল নীতি

বাংলাদেশের উচ্চ আদালত সালিশি আইনকে সম্মান করার বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। কয়েকটি মূল নীতি হলো:

Arbitration Agreement থাকলে আদালত সাধারণত হস্তক্ষেপ করে না

Arbitration Act, 2001 অনুযায়ী পক্ষদ্বয়ের লিখিত সালিশি চুক্তিকে আদালত অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।
যদি কোনো মামলা আদালতে দায়ের হয় এবং দেখা যায় সেখানে Arbitration Clause রয়েছে, তাহলে আদালত সাধারণত মামলা গ্রহণ না করে সালিশিতে যেতে নির্দেশ দেয়।

সালিশি রায় চ্যালেঞ্জ করার পরিধি সীমিত

সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে বলেছে:

  • রায়ের যুক্তি বা সিদ্ধান্ত পছন্দ হয় কি না, তা বিচার্য নয়
  • কেবল নির্দিষ্ট আইনি ত্রুটি থাকলে রায় বাতিলযোগ্য
    এটি arbitration-এর “Finality” বা চূড়ান্ততার নীতি সুরক্ষা করে।

সালিশি রায়ের কার্যকরীতা আদালত নিশ্চিত করে

Section 44 অনুযায়ী সালিশি রায় আদালতের দেওয়ানি ডিক্রির মতো নির্বাহযোগ্য।
আদালত প্রযোজ্য আইন অনুসারে রায়ের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে, যেমন:

  • সম্পত্তি সংরক্ষণ,
  • বাজেয়াপ্তি,
  • পাওনা আদায় ইত্যাদি।

গ্রামাঞ্চলের স্থানীয় সালিশ বনাম আইনগত arbitration

গ্রামে সাধারণত ইউনিয়ন পরিষদ বা সমাজপতিদের নেতৃত্বে “গ্রাম সালিশ” প্রচলিত।
কিন্তু:

আইনগত সালিশি (Arbitration Act, 2001) এবং গ্রামীন সালিশ এক নয়।

গ্রামীণ সালিশ:

  • সামাজিক প্রথা
  • আইনীভাবে বাধ্যতামূলক নয়
  • মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি থাকে
  • অনেক সময় পক্ষপাতমূলক হয়

আইনগত সালিশ (Legal Arbitration):

  • আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত
  • সিদ্ধান্ত আদালতে কার্যকর করা যায়
  • উভয় পক্ষের লিখিত সম্মতি থাকে
  • নিরপেক্ষ সালিশকারী নির্বাচন হয়

এ কারণে আদালত সবসময় আইনসম্মত arbitration-কে অগ্রাধিকার দেয় এবং গ্রামীণ সালিশকে বিচার-বহির্ভূত পদ্ধতি হিসেবে দেখে।

নাগরিকদের করণীয় ও পরামর্শ

সালিশি বোর্ড (Arbitration) ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য বাস্তব নির্দেশনা

সালিশি একটি সহজ, দ্রুত এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচের আইনগত সমাধান—তবে সঠিকভাবে ব্যবহার না হলে জটিলতা বা আইনি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। নিচে সাধারণ নাগরিকরা কীভাবে আইনসম্মত সালিশি প্রক্রিয়া ব্যবহার করবেন তার করণীয় ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করা হলো।

প্রথমেই যাচাই করুন—সালিশি চুক্তি (Arbitration Agreement) আছে কিনা

যদি আপনি কোনো চুক্তি (Agreement/Contract) করে থাকেন, দেখুন সেখানে কোনো Arbitration Clause আছে কি না।
যেমন:

  • ব্যবসায়িক চুক্তি
  • ভাড়া চুক্তি
  • নির্মাণ/সাপ্লাই কনট্রাক্ট
  • পার্টনারশিপ ব্যবসার পানি
  • সেবা প্রদান/গ্রহণ সংক্রান্ত চুক্তি

যদি Arbitration Clause থাকে, বিরোধ তৈরি হলে আপনাকে আদালতের আগে সালিশিতে যেতে হবে।
যদি না থাকে, বিরোধ সৃষ্টির পরও উভয় পক্ষ লিখিত সম্মতিতে সালিশিতে যেতে পারে।

 সালিশকারী (Arbitrator / Tribunal) নির্বাচন করবেন কীভাবে?

নিরপেক্ষ সালিশকারী বেছে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত:

  • উভয় পক্ষের সম্মতি
  • একজন বা তিনজন সালিশকারী
  • দক্ষতা ও সৎ ব্যক্তিত্ব বিবেচনায় নির্বাচন
  • সম্ভব হলে অভিজ্ঞ আইনজীবী/অবসরপ্রাপ্ত বিচারক/প্রতিষ্ঠিত সালিশি প্রতিষ্ঠান (যেমন: BIAC)

যদি সালিশকারী নিয়ে পক্ষদ্বয় একমত না হন:
আদালত (District Judge) সালিশকারী নিয়োগ করতে পারেন।

 সালিশি প্রক্রিয়ায় আপনার করণীয়

  • প্রাপ্ত নোটিশ ও সময়সীমা অনুসরণ করুন
  • প্রয়োজনীয় দলিলাদি সংগ্রহ করে জমা দিন
  • প্রমাণ, সাক্ষ্য বা নথি সুসংগতভাবে উপস্থাপন করুন
  • শুনানিতে উপস্থিত থাকুন
  • সালিশকারীকে ভদ্র, স্পষ্ট ও সত্য তথ্য দিন

সালিশি প্রক্রিয়া আদালতের মতো আনুষ্ঠানিক নয়, তবে প্রমাণ যত শক্তিশালী, রায় ততটাই আপনার পক্ষে যাবে।

রায়ের (Arbitral Award) পর করণীয়

  • সালিশি রায় লিখিত আকারে সরবরাহ করা হবে
  • রায়ে উল্লেখিত টাকা/কাজ/সম্মতি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করুন

যদি অন্য পক্ষ রায় মানতে অস্বীকার করে:

  • দেওয়ানি আদালতে “Execution” আবেদন করতে পারবেন
  • আদালত রায়ের ব্যয়বহুল কার্যকর করবে

যদি রায় অন্যায় মনে হয়?

সালিশি রায় চ্যালেঞ্জ করা যায় Section 42 অনুযায়ী, তবে শুধুমাত্র নিম্নলিখিত কারণে:

  • পক্ষপাতিত্ব
  • নোটিশ না পাওয়া
  • সালিশি চুক্তি অবৈধ
  • ক্ষমতার বাইরে গিয়ে রায়
  • প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি, সাধারণ অসন্তুষ্টি বা রায় পছন্দ না হওয়া রায় বাতিলের কারণ নয়।

সম্ভব হলে আদালতে যাওয়ার আগে আইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

গ্রামীন সালিশ ও আইনগত সালিশ—সঠিকটি বেছে নিন

গ্রামীন সালিশ অনেক ক্ষেত্রে পক্ষপাতমূলক বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি রাখে।
ভূমি বিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা, নারী নির্যাতন, বিবাহবিচ্ছেদ ইত্যাদি বিষয়ে গ্রামীন সালিশ আইনসম্মত নয়।

আইনগত সালিশ (Arbitration Act, 2001):

  • লিখিত চুক্তি
  • নিরপেক্ষ সালিশকারী
  • আদালতে রায় কার্যকর
  • মানবাধিকার রক্ষা নিশ্চিত

যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিরোধে অবশ্যই আইনগত সালিশি প্রক্রিয়া বেছে নিন।

সালিশি বোর্ড (Arbitration) সম্পর্কে সাধারণ মানুষের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও সংক্ষিপ্ত আইনি উত্তর

 প্রশ্ন: সালিশি বোর্ডে যেতে কি আদালতের অনুমতি লাগে?

উত্তর: না। যদি লিখিত সালিশি চুক্তি থাকে, আদালতের অনুমতি ছাড়াই সালিশিতে যেতে পারবেন। চুক্তি না থাকলে উভয় পক্ষ লিখিত সম্মতিতে সালিশিতে যেতে পারে।

 প্রশ্ন: সালিশি রায় (Arbitral Award) কি আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, তবে সীমিত কারণে। Arbitration Act, 2001 এর Section 42 অনুযায়ী—পক্ষপাতিত্ব, নোটিশ না পাওয়া, ক্ষমতার বাইরে রায়, বা গুরুতর প্রক্রিয়াগত ত্রুটি থাকলে রায় বাতিলের আবেদন করা যায়।

প্রশ্ন: সালিশি এবং গ্রামীন সালিশ কি একই জিনিস?

উত্তর: না। গ্রামীন সালিশ সামাজিক রীতি মাত্র, আইনি সালিশ নয়। আইনগত সালিশ (Arbitration Act, 2001 অনুযায়ী) লিখিত চুক্তি, নিরপেক্ষ সালিশকারী এবং আদালতে রায় কার্যকর করার ক্ষমতা রাখে।

প্রশ্ন: কোন বিরোধ সালিশির আওতায় আনা যায় না?

উত্তর: ফৌজদারি মামলা, তালাক-ভরণপোষণসহ পারিবারিক আইন, কর-সংক্রান্ত বিরোধ, ভূমি অধিগ্রহণ, শ্রম আইনের বিশেষ বিষয় এবং জনস্বার্থ/নিরাপত্তা বিষয় সালিশির আওতায় আসে না।

প্রশ্ন: সালিশি প্রক্রিয়া কতদিন লাগে?

উত্তর: সাধারণত বিরোধের জটিলতার ওপর নির্ভর করে। তবে আদালতের তুলনায় দ্রুত—অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসেই সালিশি শেষ হয়।

 প্রশ্ন: সালিশকারী কি আইনজীবী হতে হবে?

উত্তর: বাধ্যতামূলক নয়। তবে পক্ষদ্বয় চাইলে আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক বা অভিজ্ঞ নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে সালিশকারী হিসেবে নিয়োগ করতে পারে।

উপসংহার 

সালিশি বোর্ড—দ্রুত ও কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তির আধুনিক পদ্ধতি

বাংলাদেশে সালিশি (Arbitration) এখন একটি অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য, শক্তিশালী এবং আইনসম্মত বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি। আদালতের জট, সময়ের অপচয় এবং ব্যয়ের চাপে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ আদালতের বাইরে বিকল্প সমাধান হিসেবে সালিশিকে বেছে নিচ্ছে।

Arbitration Act, 2001 সালিশির পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং কার্যকর করার আইনি ভিত্তি প্রদান করেছে। চুক্তির মাধ্যমে আগেই সালিশি সম্মতি নির্ধারণ করা, পক্ষদ্বয়ের সম্মতিতে সালিশকারী নির্বাচন, যুক্তিসঙ্গত শুনানি, এবং শেষ পর্যন্ত Arbitral Award—সবকিছুই আইনি সুরক্ষার আওতায় থাকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: সালিশি রায় আদালতের ডিক্রির মতোই শক্তিশালী ও কার্যকর।

যদিও গ্রামীণ প্রথাগত সালিশ এখনও প্রচলিত, তবে আইনি সালিশই নিরাপদ, মানবাধিকারসম্মত এবং আদালতে স্বীকৃত। তাই যেকোনো বাণিজ্যিক বা দেওয়ানি বিরোধে সালিশি চুক্তির মাধ্যমে সমাধান খোঁজা বুদ্ধিমানের কাজ।

সমঝোতা, আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান এবং শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক অটুট থাকে, এটাই সালিশির সবচেয়ে বড় সাফল্য।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *