কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের নিয়ম: সম্পূর্ণ গাইড (২০২৬)

কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের নিয়ম: সম্পূর্ণ গাইড (২০২৬)

 বর্তমান ডিজিটাল যুগে ব্যবসা, ব্র্যান্ডিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, সফটওয়্যার, ডিজাইন, গান, বই, সবকিছুই অনায়াসে কপি বা নকল করা সম্ভব। ফলে সৃষ্টিকর্মের মালিকানা রক্ষা এবং ব্যবসার পরিচিতি বজায় রাখা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণেই কপিরাইট এবং ট্রেডমার্ক, এই দুইটি আইনগত ব্যবস্থা স্রষ্টা ও ব্যবসা মালিকদের জন্য নিরাপত্তার বর্ম হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশে কপিরাইট সুরক্ষা দেয় সৃষ্টিশীল কাজকে, যেমন লেখা, ছবি, ভিডিও, সফটওয়্যার, সংগীত, চলচ্চিত্র, ডিজাইন ইত্যাদি। অন্যদিকে ট্রেডমার্ক সুরক্ষা দেয় ব্যবসার নাম, লোগো, স্লোগান, ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি ও মার্কেট রিপ্রেজেন্টেশনকে। অর্থাৎ, কপিরাইট রক্ষা করে আপনার “মেধাসত্ত্ব”, আর ট্রেডমার্ক রক্ষা করে আপনার “ব্যবসায়িক পরিচয়”।

সঠিকভাবে নিবন্ধন করা না থাকলে:

  • আপনার তৈরি কনটেন্ট বা পণ্য অন্যরা দাবী করতে পারে,
  • ব্র্যান্ড নাম কপি করে প্রতারণামূলক ব্যবসা করতে পারে,
  • বাজারে ব্যবসার সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে,
  • আইনগত সহায়তা পাওয়াও কঠিন হয়ে যেতে পারে।

এজন্যই কপিরাইট ও ট্রেডমার্কের আইনি সুরক্ষা বুঝা, সঠিক সময়ে নিবন্ধন করা এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রতিটি ব্যবসায়ী ও স্রষ্টার জন্য অপরিহার্য।

এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের নিয়ম, সংশ্লিষ্ট ধারা, আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি, এবং সাধারণ নাগরিকদের জন্য কার্যকর পরামর্শ সহজ ভাষায় উপস্থাপন করবো।

আপনি যদি একজন ব্যবসায়ী, গ্রাফিক ডিজাইনার, লেখক, ইউটিউবার, অ্যাপ ডেভেলপার, সংগীতশিল্পী বা ব্র্যান্ড তৈরি করতে চান, এই নিবন্ধটি আপনার জন্য সম্পূর্ণ গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশে কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের আইনগত ভিত্তি

এই অংশে আমরা দুটি পৃথক আইনি কাঠামো, (১) কপিরাইট আইন এবং (২) ট্রেডমার্ক আইন, সংক্ষেপে উপস্থাপন করবো। উভয় আইন ব্যবসা ও সৃজনশীল কাজকে সুরক্ষা দেয় ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে।

কপিরাইট আইন (Copyright Law)

প্রযোজ্য আইন:

কপিরাইট আইন, ২০০০ (Copyright Act, 2000)
পরবর্তীতে কপিরাইট (সংশোধন) আইন, ২০০৫ দ্বারা সংশোধিত।

কোন কোন কাজ কপিরাইট সুরক্ষা পায়:

আইনের ২(২৩) ধারায় “কপিরাইটেড ওয়ার্ক” হিসেবে যেসব কাজ সংজ্ঞায়িত:

  • সাহিত্যকর্ম (Books, Articles, Scripts)
  • সংগীত ও গান
  • নাট্যকর্ম
  • চিত্রকলার কাজ (Drawing, Painting, Illustration)
  • ফটোগ্রাফি
  • চলচ্চিত্র ও ভিডিও
  • কম্পিউটার প্রোগ্রাম / সফটওয়্যার
  • ওয়েবসাইটের কনটেন্ট বা ডিজাইন
  • অডিওভিজ্যুয়াল কনটেন্ট

মূল ধারা ও আইনি ব্যাখ্যা:

ধারা ১৫ – কপিরাইট নিবন্ধনের আবেদন

কেউ তার সৃষ্টিকর্ম নিবন্ধন করতে চাইলে কপিরাইট অফিসে আবেদন করতে পারে। এটি বাধ্যতামূলক নয়, তবে আদালতে প্রমাণ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ধারা ১৭ – কপিরাইট মালিকানার অধিকার

সৃষ্টিকর্ম তৈরির সঙ্গে সঙ্গে “স্বয়ংক্রিয়ভাবে” (Automatically) কপিরাইট সুরক্ষা শুরু হয়।

ধারা ১৯ – কপিরাইট লঙ্ঘনের সংজ্ঞা

অনুমতি ছাড়া নকল করা, বিক্রি করা, আপলোড করা বা প্রকাশ করা অপরাধ।

ধারা ৭১ – ফৌজদারি শাস্তি

কপিরাইট লঙ্ঘন করলে:

  • ৬ মাস থেকে ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড
  • ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা
  • উভয় দণ্ডই হতে পারে

ট্রেডমার্ক আইন (Trademark Law)

প্রযোজ্য আইন:

ট্রেডমার্ক আইন, ২০০৯ (The Trademarks Act, 2009)

ট্রেডমার্ক কী সুরক্ষা দেয়:

আইনের ২(৮) ধারায় ট্রেডমার্কের সংজ্ঞা—

  • ব্র্যান্ড নাম
  • লোগো
  • স্লোগান
  • সাইন, সিম্বল
  • শব্দ, লেটার, ন্যূমেরাল
  • শেপ বা সাজসজ্জা
  • রঙের কম্বিনেশন
  • প্রোডাক্টের প্যাকেজিং

মূল ধারা ও আইনি ব্যাখ্যা:

ধারা ১৫ – ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের আবেদন

ব্যবসার নামে TM নিবন্ধনের জন্য পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তরে (DPDT) আবেদন করতে হয়।

ধারা ২১ – পরীক্ষণ (Examination) প্রক্রিয়া

নামের সঙ্গে মিল আছে কি না, আইনগতভাবে বৈধ কি না, এসব যাচাই করা হয়।

ধারা ২৯ – আপত্তি (Opposition)

অন্য কেউ আপত্তি করতে পারে যদি মনে করে নাম বা লোগো তার অধিকার লঙ্ঘন করছে।

ধারা ৩৭ – নিবন্ধিত মালিকের অধিকার

নিবন্ধিত ট্রেডমার্ক ব্যবহারের একচ্ছত্র অধিকার মালিকের থাকে।

ধারা ৭৩ – লঙ্ঘনের শাস্তি

নকল বা অননুমোদিত ব্যবহারে:

  • ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড
  • সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা জরিমানা

উভয় দণ্ডই হতে পারে

কপিরাইট বনাম ট্রেডমার্ক—মূল পার্থক্য (আইন অনুযায়ী)

বিষয় কপিরাইট ট্রেডমার্ক
আইন কপিরাইট আইন ২০০০ ট্রেডমার্ক আইন ২০০৯
সুরক্ষা দেয় সৃষ্টিশীল কাজ ব্র্যান্ড পরিচয়
সুরক্ষার শুরু সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে নিবন্ধনের পর
মেয়াদ সৃজনকারীর মৃত্যুর পর ৬০ বছর সাধারণত ৭–১০ বছর (নবায়নযোগ্য)
প্রয়োগ কনটেন্ট, গান, সফটওয়্যার ব্র্যান্ড নাম, লোগো, স্লোগান

বাস্তব উদাহরণ ও আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশে কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক লঙ্ঘন সংক্রান্ত বহু মামলা হয়েছে, যেখানে আদালত স্পষ্টভাবে সৃষ্টিকর্ম ও ব্র্যান্ড পরিচয়ের মালিকানা সুরক্ষা দিয়েছেন। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ও বিচারিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো।

কপিরাইট সংক্রান্ত বাস্তব উদাহরণ

কপিরাইট সংক্রান্ত বাস্তব উদাহরণ

উদাহরণ ১: অনলাইন কনটেন্ট কপি করে ব্যবহার করার মামলা

অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ইউটিউব ভিডিও, ফটোগ্রাফ, বা আর্টিকেল অন্যেরা অনুমতি ছাড়া কপি করে ব্যবহার করে।
একটি মামলায় আদালত রায় দেন যে:

  • সৃষ্টিকর্ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কপিরাইট সুরক্ষায় পড়ে (কপিরাইট আইন, ধারা ১৭)।
  • তাই নিবন্ধন না থাকলেও মালিকানা প্রমাণ করা গেলে ক্ষতিপূরণ দাবি করা যায়।

আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আপলোড করা কনটেন্টও কপিরাইট সুরক্ষার আওতায় পড়ে এবং কপি-পেস্ট করাকে আদালত “কপিরাইট লঙ্ঘন” হিসেবে গণ্য করেছেন।

উদাহরণ ২: সফটওয়্যার/ওয়েবসাইট কোড কপি করার মামলা

বাংলাদেশে একাধিক বার দেখা গেছে যে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো একে অন্যের কোড চুরি করে ব্যবসা চালায়।
একটি মামলায় আদালত বলেন:

  • কম্পিউটার প্রোগ্রাম হলো “সাহিত্যকর্মের” অন্তর্ভুক্ত (ধারা ২(২৩))।
  • ফলে কোড কপি করলে তা পরিষ্কারভাবে কপিরাইট লঙ্ঘন।

আদালতের সিদ্ধান্ত: নকল সফটওয়্যার বিক্রি করা বা কোড চুরি করা হলে ফৌজদারি মামলা হতে পারে এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করা যাবে।

ট্রেডমার্ক সংক্রান্ত বাস্তব উদাহরণ

উদাহরণ ৩: ব্র্যান্ড নাম নকল করে পণ্য বিক্রি

একটি জনপ্রিয় কসমেটিক্স ব্র্যান্ডের নামের সঙ্গে মিল রেখে অন্য এক কোম্পানি নাম ব্যবহার করছিল।
ট্রেডমার্ক আইন অনুযায়ী, এটি “ডিসেপটিভ সিমিলারিটি”।

আদালতের অবস্থান:

  • নাম ও প্যাকেজিং যদি ভোক্তাকে বিভ্রান্ত করে, তবে তা লঙ্ঘন।

নিবন্ধিত মালিকের একচ্ছত্র অধিকার (ধারা ৩৭) লঙ্ঘন হলে আদালত নিষেধাজ্ঞা এবং ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন।

উদাহরণ ৪: লোগো নকল করে ব্যবসা চালানো

একটি ছোট ব্যবসা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মতো দেখতে লোগো ব্যবহার করছিল।
ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর ও আদালত বলেন:

  • লোগো ব্র্যান্ড পরিচয়ের একটি প্রধান অংশ।
  • ভোক্তাকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে মিল রাখা লোগো ব্যবহার করা অপরাধ।

আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি: নিবন্ধন থাকুক বা না থাকুক, যদি প্রমাণ হয় লোগোটি আগেই অন্যের ব্যবহারে ছিল, তবে মূল মালিক আইনি সুরক্ষা পাবেন।

আদালতের সার্বিক অবস্থান (কোর্টের প্রাকটিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি)

  • ট্রেডমার্ক নিবন্ধন থাকলে মামলা প্রমাণ করা সহজ হয়।
  • স্বয়ংক্রিয় কপিরাইট সুরক্ষা আদালত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন।
  • ডিজিটাল কনটেন্টকে আদালত সম্পূর্ণভাবে কপিরাইটেড কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
  • ডিসেপটিভ সিমিলারিটি থাকলে ব্যবসা বন্ধের নির্দেশ পর্যন্ত দেওয়া হয়।
  • ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি অপরাধমূলক শাস্তিও হতে পারে।

নাগরিকদের করণীয় ও পরামর্শ

বাংলাদেশে কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক সুরক্ষার জন্য সাধারণ নাগরিক, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের যে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তা নিচে ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো।

কপিরাইট সুরক্ষার জন্য করণীয়

নিজের সৃষ্টিকর্ম প্রমাণ রাখুন

  • কনটেন্ট তৈরির তারিখ
  • সোর্স ফাইল (PSD, AI, RAW ফাইল)
  • স্ক্রিপ্ট/ড্রাফট
  • মেটাডেটা
    এই প্রমাণগুলো আদালতে মালিকানা প্রমাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 কপিরাইট অফিসে নিবন্ধন করুন (যদিও বাধ্যতামূলক নয়)

Copyright Office, Dhaka
আবেদনের সুবিধা:

  • মালিকানা প্রমাণ সহজ
  • মামলায় শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে গণ্য
  • ব্যবসায় ও বিদেশে কাজ করার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি

 নিজের সৃষ্টিকর্মে Notice ব্যবহার করুন

যেমন: © 2025 [Your Name]. All Rights Reserved.

এতে অন্যরা সহজেই বুঝতে পারে কাজটি সুরক্ষিত।

নকল করা হলে আইনি নোটিশ পাঠান

  • কপিরাইট আইন, ২০০০ (ধারা ১৯, ৭১) অনুযায়ী
  • লিগ্যাল নোটিশ → মামলা → ক্ষতিপূরণ দাবি

ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের জন্য করণীয়

১. ব্র্যান্ড নাম নির্বাচনের আগে Search করুন

DPDT (Department of Patents, Designs & Trademarks)–এ গিয়ে আগে থেকেই নাম বা লোগো আছে কি না তা পরীক্ষা করুন।
এটি মিল বা সাদৃশ্য (similarity) ঝুঁকি কমায়।

ট্রেডমার্ক আবেদন করুন (TM Form)

আবেদনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:

  • আবেদন ফরম
  • লোগো (যদি থাকে)
  • পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (প্রয়োজনে)
  • ব্যবসা/সংস্থা সংক্রান্ত তথ্য

 পরীক্ষণ ও আপত্তি মোকাবিলা করুন

Examination Report এ যদি আপত্তি আসে:

  • সংশোধন
  • ব্যাখ্যা

নথিপত্র জমা
এর মাধ্যমে আপত্তি পরিষ্কার করতে হয়।

নিবন্ধন পাওয়ার পর ® চিহ্ন ব্যবহার করুন

যেমন:
Law Doors®

এটি আপনার ব্র্যান্ডের একচ্ছত্র অধিকার নিশ্চিত করে।

ট্রেডমার্ক নবায়ন করতে ভুলবেন না

সাধারণত ৭ বছর পর নবায়ন প্রয়োজন।
নবায়ন না করলে অধিকার হারাতে পারেন।

নকলকরণ বা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে করণীয়

প্রমাণ সংগ্রহ করুন

  • স্ক্রিনশট
  • লিঙ্ক
  • কপি ফাইল

প্রিন্ট স্ক্রিন
লঙ্ঘনের তারিখ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 লিগ্যাল নোটিশ পাঠান

আইনজীবীর মাধ্যমে “Cease & Desist Notice” পাঠান।

ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা

  • কপিরাইট লঙ্ঘন: ধারা ৭১ অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা
  • ট্রেডমার্ক লঙ্ঘন: ধারা ৭৩ অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা

ক্ষতিপূরণ দাবি: দেওয়ানি মামলা

 উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য পরামর্শ

  • ব্র্যান্ড শুরু করার আগে নাম সার্চ করুন।
  • ব্যবসা শুরু করলে ট্রেডমার্ক ফাইল করুন, এটি ব্র্যান্ডের সম্পদ
  • ইউটিউবার/কনটেন্ট ক্রিয়েটররা নিয়মিত কপিরাইট নোটিশ যুক্ত রাখুন।
  • ডিজাইনার/ডেভেলপাররা কাজের সোর্স ফাইল সংরক্ষণ করুন।
  • অনলাইন কনটেন্ট হলে DMCA টেকডাউন ব্যবহার করুন (আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে)।
  • নকলকারীদের সঙ্গে তর্ক না করে আইনগত পথ অনুসরণ করুন।
  • সৃজনশীল কাজ কখনো “অনলাইনে রেখে দিলেই মালিক” হয়ে যায় না, প্রমাণ রাখতে হয়।

অনলাইন ব্যবসার আইনি করণীয়, এ বিষয়ে আমাদের Law Doors ওয়েবসাইটে বিস্তারিত একটি নিবন্ধ রয়েছে, প্রয়োজন হলে পরে দেখে নিতে পারেন।

নিচে সাধারণ নাগরিকদের সবচেয়ে বেশি করা ৫টি প্রশ্নের সহজ, স্পষ্ট ও আইনসম্মত উত্তর দেওয়া হলো।

 প্রশ্ন: কপিরাইট কি নিবন্ধন ছাড়া পাওয়া যায়?

উত্তর: হ্যাঁ। কপিরাইট আইন, ২০০০ অনুযায়ী সৃষ্টিকর্ম তৈরি হওয়ার মুহূর্ত থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কপিরাইট সুরক্ষা পাওয়া যায়। তবে নিবন্ধন থাকলে আইনি প্রমাণ দিতে সুবিধা হয়।

প্রশ্ন: ট্রেডমার্ক নিবন্ধন কতদিনের জন্য বৈধ?

উত্তর: ট্রেডমার্ক আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ট্রেডমার্ক সাধারণত ৭ বছর মেয়াদে নিবন্ধিত হয় এবং সময়মতো নবায়ন করলে এটি অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বহাল রাখা যায়।

 প্রশ্ন: কেউ আমার লোগো বা ব্র্যান্ড নাম কপি করলে কী করবো?

উত্তর: প্রথমে প্রমাণ সংগ্রহ করুন, এরপর আইনজীবীর মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান → প্রয়োজনে ট্রেডমার্ক আইন, ২০০৯ এর ধারা ৭৩ অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা ও ক্ষতিপূরণ দাবির দেওয়ানি মামলা করতে পারবেন।

প্রশ্ন: অনলাইনে আপলোড করা ছবি বা ভিডিও কি কপিরাইট সুরক্ষায় পড়ে?

উত্তর: হ্যাঁ। অনলাইন কনটেন্টও কপিরাইট আইন অনুযায়ী “সাহিত্য ও শিল্পকর্ম” হিসেবে সুরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে তা কপিরাইট লঙ্ঘন।

 প্রশ্ন: আমি নতুন একটি ব্র্যান্ড শুরু করতে চাই—নাম ফাইনাল করার আগে কী করণীয়?

উত্তর: DPDT-তে (Department of Patents, Designs & Trademarks) নাম সার্চ করে নিশ্চিত করুন যে নাম বা লোগো আগেই কেউ নিবন্ধন করেনি। সঠিক হলে TM আবেদন করুন।

উপসংহার 

কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক, উভয়ই সৃজনশীলতা এবং ব্যবসায়িক পরিচয় সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য আইনি ব্যবস্থা। বর্তমান ডিজিটাল বিশ্বে নকল, ব্র্যান্ড কপি, কনটেন্ট চুরি, লোগো অনুকরণ, এসব ঝুঁকি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। তাই ব্যক্তি, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, উদ্যোক্তা কিংবা প্রতিষ্ঠানের জন্য তাদের সৃষ্টি ও ব্র্যান্ডকে সুরক্ষিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

কপিরাইট আপনার সৃষ্টিকর্মকে সুরক্ষা দেয় সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে, আর ট্রেডমার্ক আপনার ব্র্যান্ডের নাম, লোগো ও সুনামকে সুরক্ষা দেয় নিবন্ধনের মাধ্যমে। উভয় ক্ষেত্রে সঠিক প্রমাণ সংরক্ষণ, নিবন্ধন করা, আইনি নোটিশ পাঠানো এবং প্রয়োজনে আদালতের সহায়তা নেওয়া, এগুলোই মালিকানার অধিকার বজায় রাখার কার্যকর উপায়।

বাংলাদেশের আইন কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের সুযোগ প্রদান করে। সুতরাং সৃষ্টিকর্ম বা ব্র্যান্ডের মালিকানা হারানোর আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।

অতএব:

  • সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ করুন
  • ব্র্যান্ড নাম ও লোগো নিবন্ধন করুন
  • নকলকারীকে আইনি পথে প্রতিরোধ করুন
  • নিজের মেধাসত্ত্বকে নিজের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করুন

সঠিক সময়ে সঠিক আইনি সুরক্ষা নিলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি অনেক কমে যায় এবং ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক উভয় ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *