ইসলামিক উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি বণ্টনের হিসাব: বাংলাদেশি আইন ও শরিয়াহ অনুযায়ী সম্পূর্ণ গাইড
ইসলামিক উত্তরাধিকার আইন (Islamic Inheritance Law) বাংলাদেশের মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি, যেমন জমি, বাড়ি, অর্থ, সঞ্চয়, স্বর্ণ, চলতি সম্পদ, সমানভাবে নয়, বরং কোরআন, হাদিস ও ইজমার ভিত্তিতে নির্ধারিত নির্দিষ্ট অনুপাতে ভাগ হয়। এ ব্যবস্থাকে বলা হয় ফরায়েজ (Faraid)।
বাংলাদেশে মুসলমানদের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার বণ্টন মূলত মুসলিম পার্সোনাল ”ল” (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট, ১৯৩৭, এবং ইসলামী শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। ফলে সম্পত্তির হিসাব করতে হয় ধর্মীয় নিয়মের আলোকে; এতে সরকারি কোনো স্বাধীন আইন নেই, বরং শরিয়তের নির্দেশই প্রধান।
বর্তমান সমাজে অনেক সময় দেখা যায়:
- উত্তরাধিকারীরা আইনি হিসাব জানে না
- কেউ কেউ ইচ্ছামতো ভাগ করে, যা পরবর্তীতে বিরোধ সৃষ্টি করে
- মেয়েরা তাদের প্রাপ্য অংশ পায় না
সম্পত্তির প্রকৃত হিসাব বের করতে বিভ্রান্তি হয়
সঠিক উত্তরাধিকার নির্ধারণ না করলে পারিবারিক বিরোধ, মামলাজট, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ইসলামী উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি কীভাবে বণ্টন হয়, কার কত অংশ থাকে, কোন ক্ষেত্রে কার অধিকার বাদ পড়ে বা যুক্ত হয়, এসব বিষয়ে সঠিক ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
এই আর্টিকেলে আপনি পাবেন:
- ইসলামী আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকার বণ্টনের মূল কাঠামো
- বাধ্যতামূলক অংশী (Sharers) ও অবশিষ্ট অংশী (Residuaries) কারা
- বাস্তব উদাহরণসহ হিসাব কিভাবে নির্ণয় করবেন
- সাধারণ নাগরিকের করণীয়
- আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি
- গুরুত্বপূর্ণ FAQ
এই প্রবন্ধটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে আইন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও সহজে বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বাংলাদেশে ইসলামী উত্তরাধিকার বণ্টনের আইনগত ভিত্তি
বাংলাদেশে মুসলমানদের উত্তরাধিকার বণ্টন শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যক্তিগত আইন দ্বারা পরিচালিত হয়। এর প্রধান কাঠামো নিম্নলিখিত উৎস থেকে এসেছে:
- কোরআনুল কারিম
- হাদিস
- ইজমা (ঐক্যমত)
- কিয়াস (তুলনামূলক বিচার)
আইনগতভাবে এ নিয়ম প্রয়োগের ভিত্তি হলো:
Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937
এই আইনের মাধ্যমে ঘোষিত হয়েছে যে, বাংলাদেশের মুসলিমদের উত্তরাধিকার, সম্পত্তি বণ্টন, বিবাহ, তালাক, ওয়াকফ ইত্যাদি বিষয়ে শরিয়াহর নিয়মই প্রযোজ্য হবে।
এ ছাড়া আদালত উত্তরাধিকার সংক্রান্ত ঝগড়া নিষ্পত্তি করতে গিয়ে শরিয়াহর ফরায়েজ নীতি অনুসরণ করে।
ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের মৌলিক কাঠামো
ইসলামিক উত্তরাধিকার বণ্টনে নিচের নিয়মগুলো বাধ্যতামূলক:
তিনটি বিষয় আগেই বাদ যাবে
উত্তরাধিকার বণ্টনের আগে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে প্রথমে বাদ দিতে হবে—
- (১) জানাজার খরচ
- (২) দেনা-পাওনা পরিশোধ
- (৩) বৈধ উইল (Wasiyat) – মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ ১/৩ পর্যন্ত
এরপর বাকি সম্পত্তি বণ্টনযোগ্য (Net Estate) হিসেবে ধরা হবে।
অংশগ্রহণকারীদের ধরন (Heirs Classification)
ইসলামে উত্তরাধিকারীরা তিন শ্রেণিতে বিভক্ত:
বাধ্যতামূলক অংশী (Sharers – ফারজ অংশ)
এদের নির্দিষ্ট অংশ কোরআনে বর্ণিত।
যেমন: স্ত্রী, স্বামী, বাবা-মা, মেয়ে, ছেলে-মেয়ে ইত্যাদি।
অবশিষ্ট অংশী (Residuaries – আসাবা)
Sharers-দের অংশ দেওয়ার পর যা থাকে, তা পায় আসাবাহগণ।
যেমন: ছেলে, ছেলে-সন্তান, ভাই ইত্যাদি।
বঞ্চিত (Excluded/Nafis)
কিছু ক্ষেত্রে কোনো উত্তরাধিকারী সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হয়।
যেমন: মৃতের ছেলে থাকলে মৃতের ভাই উত্তরাধিকার পায় না।
পুরুষ ও নারীর অংশের ভিত্তি
ইসলামে সরাসরি কোনো নিয়ম নেই যে সর্বক্ষেত্রেই মহিলার অংশ পুরুষের অর্ধেক হবে।
বরং অংশ নির্ভর করে নিচের বিষয়ের ওপর:
- মৃতের সঙ্গে আত্মীয়তার দূরত্ব
- পরিবারে অন্য উত্তরাধিকারীর উপস্থিতি
- নির্দিষ্ট কোরআনিক বিধান
উদাহরণ:
- মা পায় ১/৬, কিন্তু
- মেয়েরা পেতে পারে ১/২ বা ২/৩
বোন কখনো ১/২, কখনো ২/৩, কখনো পুরো অবশিষ্ট পায়
প্রধান শরিয়াহ ধারাগুলো (Quranic Shares) সংক্ষেপে
পুরুষ উত্তরাধিকারীদের অংশ (সংক্ষেপে):
- স্বামী – ১/২ বা ১/৪
- বাবা – ১/৬ + অবশিষ্ট (চাইলেই)
- ছেলে – অবশিষ্টের পুরোটা আসাবাহ হিসেবে
- ভাই – আসাবাহ, নির্দিষ্ট শর্তে
নারী উত্তরাধিকারীদের অংশ (সংক্ষেপে):
- স্ত্রী – ১/৪ বা ১/৮
- মা – ১/৩ বা ১/৬
- এক মেয়ে – ১/২
- একাধিক মেয়ে – ২/৩
- বোন – ১/২ বা ২/৩ বা আসাবাহ
বাংলাদেশি আদালতে শরিয়াহ প্রয়োগ
বাংলাদেশের সিভিল কোর্ট (জজ কোর্ট) উত্তরাধিকার মামলার ক্ষেত্রে—
- ইসলামী ফরায়েজ নিয়ম অনুসরণ করে অংশ নির্ধারণ করে
- প্রমাণাদির ভিত্তিতে বৈধ ওয়ারিশ ঠিক করে
- প্রযোজ্য শরিয়াহ বই যেমন হেদায়া (Al-Hidaya) এবং অন্যান্য ইসলামী জুরিসপ্রুডেন্স গ্রন্থ ব্যবহার করে
- 1937 সালের আইনের নির্দেশ অনুযায়ী শরিয়াহকে প্রাধান্য দেয়
ইসলামী উত্তরাধিকার বণ্টন—ব্যবহারিক উদাহরণ ও আদালতের বিশ্লেষণ
ইসলামী উত্তরাধিকার হিসাব বোঝার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বাস্তব উদাহরণ। নিচে সহজবোধ্য কেস স্টাডি ও বাংলাদেশি আদালতের প্রযোজ্য দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হলো।

উদাহরণ–১: বাবা মারা গেলে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে
পরিস্থিতি:
মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী:
- স্ত্রী = ১ জন
- ছেলে = ১ জন
- মেয়ে = ১ জন
প্রথম ধাপ: জানাজা খরচ, দেনা পরিশোধ, ওয়াসিয়ত বাদ
ধরা যাক সম্পত্তির নিট মূল্য = ১২ লাখ টাকা
দ্বিতীয় ধাপ: অংশ বণ্টন
- স্ত্রী
- স্বামী-সন্তান থাকলে অংশ = ১/৮
- ১২,০০,০০০ × ১/৮ = ১,৫০,০০০ টাকা
- ছেলে ও মেয়ে
- Sharers অংশ নিযুক্ত করার পর অবশিষ্ট অংশ ছেলে-মেয়ের মাঝে “ছেলের অংশ = মেয়ের দ্বিগুণ” নিয়মে বণ্টন।
অবশিষ্ট = ১২,০০,০০০ – ১,৫০,০০০ = ১০,৫০,০০০ টাকা
ছেলে : মেয়ে = ২ : ১
মোট অংশ = ৩
- ছেলের পাওয়া অংশ = (২/৩) × ১০,৫০,০০০ = ৭,০০,০০০ টাকা
- মেয়ের পাওয়া অংশ = (১/৩) × ১০,৫০,০০০ = ৩,৫০,০০০ টাকা
উদাহরণ–২: সন্তান নেই, স্ত্রী, মা-বাবা জীবিত
পরিস্থিতি:
উত্তরাধিকারী: স্ত্রী + মা + বাবা
নিট সম্পত্তি = ৬ লাখ টাকা
বণ্টন:
স্ত্রী (সন্তান না থাকলে) = ১/৪
= ১,৫০,০০০ টাকা
মা (সন্তান না থাকলে) = ১/৩
= ২,০০,০০০ টাকা
বাবা বাকি সম্পত্তি + বাধ্যতামূলক অংশ
বাবার ফারজ অংশ = ১/৬ (কিন্তু মা ১/৩ পাওয়ায় বাবার আসাবাহ হিসেবেও বাকি অংশ প্রাপ্য)
অবশিষ্ট = ৬,০০,০০০ – (১,৫০,০০০ + ২,০০,০০০)
= ২,৫০,০০০ টাকা
বাবা পান = ১/৬ + আসাবাহ হিসেবে অবশিষ্ট
= ১,০০,০০০ + ২,৫০,০০০
= ৩,৫০,০০০ টাকা
উদাহরণ–৩: শুধুমাত্র ২ মেয়ে, অন্য কোনো সন্তান বা ভাই-বোন নেই
পরিস্থিতি:
উত্তরাধিকারী: ২ মেয়ে
নিট সম্পত্তি = ৯ লাখ টাকা
বণ্টন:
মেয়ে একাধিক হলে = ২/৩ যৌথ অংশ
= ৯,০০,০০০ × (২/৩)
= ৬,০০,০০০ টাকা
বাকি ১/৩ সম্পত্তি “উলিল আরহাম” না থাকায় রাষ্ট্রের বাইটুলমাল বা নিকটবর্তী আসাবাহ টাইপ আত্মীয় (চাচা, চাচাতো ভাই) পেতে পারে।
মাতা-পিতার সম্পত্তিতে মেয়ের অধিকার , এ বিষয়ে আমাদের Law Doors ওয়েবসাইটে বিস্তারিত একটি নিবন্ধ রয়েছে, প্রয়োজন হলে পরে দেখে নিতে পারেন।
আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি (Bangladesh Civil Courts)
বাংলাদেশি আদালত সাধারণত নিম্নোক্ত নীতি অনুসরণ করে:
1937 সালের শরিয়ত অ্যাপ্লিকেশন আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত
কোনো উইল, হেবা বা মৌখিক দাবি থাকলেও, উত্তরাধিকার বণ্টন অবশ্যই শরিয়াহ অনুযায়ী হবে।
হেদায়া, ফাতাওয়া-এ-আলামগিরি ইত্যাদি জুরিসপ্রুডেন্স বই ব্যবহার
উত্তরাধিকার নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে আদালত ইসলামী আইন গ্রন্থ ব্যবহার করে অংশ নির্ধারণ করে।
প্রমাণ অনুযায়ী ওয়ারিশ নির্ধারণ
- জন্ম সনদ
- জাতীয় পরিচয়পত্র
- বিবাহ নিবন্ধন
- সম্পর্ক প্রমাণের সাক্ষ্য
- মৃতের সম্পত্তির পরিমাণ
সব কিছু গুরুত্ব সহকারে যাচাই করা হয়।
বঞ্চিত ওয়ারিশের দাবি আদালত সাধারণত গ্রহণ করে না
যেমন: মৃতের ছেলে জীবিত থাকলে মৃতের ভাইয়ের অংশ নেই:
উনি দাবি করলেও আদালত শরিয়াহ মতে বঞ্চিত বলেই ধরে।
মেয়েদের অংশ নিয়ে বিরোধ সবচেয়ে বেশি
আদালত মেয়েদের প্রাপ্য অংশ শরিয়াহ অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিশ্চিত করে; মেয়েরা সাধারণত কম পায়,এ ধরনের কাস্টম ও সামাজিক চাপে আদালত আপস করে না।
ইসলামী উত্তরাধিকার বণ্টনে সাধারণ মানুষের কী করা উচিত?
ইসলামিক ফরায়েজ অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন করতে হলে শুধু ধর্মীয় জ্ঞান নয়, আইনি সচেতনতারও প্রয়োজন হয়। নিচে ধাপে ধাপে সাধারণ নাগরিক কীভাবে সঠিকভাবে উত্তরাধিকার বণ্টন করতে পারে তা তুলে ধরা হলো—
মৃত্যুর পরপরই সম্পত্তির তালিকা তৈরি করুন
মৃত ব্যক্তির মালিকানাধীন সব সম্পত্তির পূর্ণ তালিকা তৈরি করতে হবে:
- জমি, ঘর, দোকান
- ব্যাংক অ্যাকাউন্ট
- নগদ অর্থ
- স্বর্ণ/রূপা
- ব্যবসায়িক শেয়ার
- গাড়ি ইত্যাদি
এটি বণ্টনের প্রথম ধাপ এবং মামলার ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য।
জানাজা খরচ, দেনা-পাওনা, ওয়াসিয়ত আগেই বাদ দিতে হবে
শরিয়াহ ও আইনের প্রথম নির্দেশ এটি।
- কারও কাছে ঋণ থাকলে আগে পরিশোধ করতে হবে
- বৈধ উইল থাকলে তা ১/৩ এর বেশি হতে পারবে না
দেনা পরিশোধের আগে কোনো উত্তরাধিকারী সম্পত্তি নিতে পারবে না
ওয়ারিশ শনাক্ত করুন (Proof of Heirs)
ওয়ারিশ কারা হবে তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
- জাতীয় পরিচয়পত্র
- জন্মসনদ
- বিবাহ নিবন্ধন
- সম্পর্ক ও উত্তরাধিকার প্রমাণের নথি
যে ওয়ারিশ বঞ্চিত (যেমন, ছেলে থাকলে ভাই), তাকে বণ্টন তালিকায় রাখা যাবে না।
ফরায়েজ হিসাব সঠিকভাবে নির্ণয় করুন
এটি সাধারণত কঠিন অংশ। এজন্য:
- ইসলামিক স্কলার বা আলেম
- অভিজ্ঞ অ্যাডভোকেট
- ফরায়েজ ক্যালকুলেটর , এর সাহায্য নেওয়া উত্তম।
ভুল হিসাব দিলে পরবর্তীতে স্থায়ী বিরোধ তৈরি হয়।
পারিবারিকভাবে লিখিতভাবে ভাগ করে নিন
মুখে মুখে ভাগ না করে লিখিত ডকুমেন্ট তৈরি করুন:
- অংশীদারদের সই
- সাক্ষীর সই
- সম্পত্তির বিবরণ
- অংশের পরিমাণ
এটি ভবিষ্যতে বিরোধ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।
জমি বণ্টন হলে রেজিস্ট্রি ও মিউটেশন (নামজারি) করুন
বণ্টন শুধু কাগজে থাকলে হবে না।
জমির ক্ষেত্রে:
- পৃথকভাবে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করুন
- ভূমি অফিসে নামজারি (Mutation) করুন
- পৃথক খতিয়ান খুলে নিন
এটি আইনি মালিকানা নিশ্চিত করে।
সমস্যা বা মতবিরোধ হলে সিভিল কোর্টে মামলা করা যায়
যদি কোনো উত্তরাধিকারী জোর করে দখল নেয়, প্রাপ্য অংশ না দেয়, বা হুমকি দেয়—
তাহলে সিভিল কোর্টে Partition Suit (বণ্টন মামলা) করা যায়।
এ মামলা সম্পূর্ণভাবে শরিয়াহর ভিত্তিতেই পরিচালিত হয়।
মেয়েদের অংশ নিশ্চিত করুন
সাধারণত আমাদের দেশে মেয়েদের অংশ বঞ্চিত করা হয়। কিন্তু আইন ও শরিয়াহ উভয় অনুযায়ী: মেয়েরা বৈধ ও পূর্ণ অধিকারী এবং তাদের অংশ অস্বীকার করলে আদালত কঠোর অবস্থান নেয়।
ইসলামী উত্তরাধিকার বণ্টন নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও সংক্ষিপ্ত আইনি উত্তর
মেয়েরা কি অবশ্যই ছেলের অর্ধেক পায়?
উত্তর: না, সব ক্ষেত্রে নয়। শরিয়াহ অনুযায়ী কারও অংশ নির্ভর করে সম্পর্ক, অবস্থান ও অন্য ওয়ারিশের উপস্থিতির ওপর। অনেক ক্ষেত্রে মেয়ের অংশ ছেলের চেয়েও বেশি হতে পারে (যেমন, এক মেয়ে থাকলে ১/২ পায়)।
উইল করলে কি শরিয়াহ অনুযায়ী ভাগ পরিবর্তন করা যায়?
উত্তর: না। উইল শুধু সম্পত্তির ১/৩ পর্যন্ত করা যায় এবং তা ওয়ারিশ নয় এমন ব্যক্তির নামে হতে পারে। ওয়ারিশের অংশ উইলের মাধ্যমে কমানো বা বাড়ানো শরিয়াহ অনুযায়ী বাতিল।
ভাই-বোন কি সবসময় উত্তরাধিকার পায়?
উত্তর: না। যদি মৃত ব্যক্তির ছেলে থাকে, তবে মৃতের ভাই উত্তরাধিকারী হিসেবে বাদ (Excluded) হয়ে যায়। অর্থাৎ ছেলে থাকলে ভাই অংশ পায় না।
বণ্টন না করে একজন ওয়ারিশ যদি সব সম্পত্তি দখলে রাখে, তাহলে কী করা যায়?
উত্তর: প্রথমে পারিবারিকভাবে আলোচনা করতে হবে। সমাধান না হলে সিভিল কোর্টে বণ্টন মামলা (Partition Suit) করা যায়। আদালত শরিয়াহ অনুযায়ী অংশ নির্ধারণ করে সবার জন্য আলাদা অংশ নিশ্চিত করবে।
বিদেশে মারা গেলে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বণ্টন হবে, নাকি বিদেশের?
উত্তর: সাধারণত সম্পত্তি যেখানে অবস্থিত, সেই দেশের আইন প্রযোজ্য হয়। তবে বাংলাদেশে থাকা সম্পত্তি অবশ্যই ১৯৩৭ সালের শরিয়ত অ্যাপ্লিকেশন আইন ও শরিয়াহ ভিত্তিতে বণ্টন হবে।
যে মেয়ের বিয়ের সময় বেশি দেনমোহর দেওয়া হয়েছে, সে কি কম উত্তরাধিকার পাবে?
উত্তর: না। দেনমোহর উত্তরাধিকার অংশকে প্রভাবিত করে না। শরিয়াহ অনুযায়ী মেয়ের উত্তরাধিকার নির্দিষ্ট এবং তা অপরিবর্তনীয়।
দেনা পরিশোধ না করে কি সম্পত্তি ভাগ করা যাবে?
উত্তর: না। শরিয়াহ ও আইন উভয় অনুযায়ী দেনা পরিশোধই প্রথম ও বাধ্যতামূলক ধাপ। দেনা পরিশোধের আগে বণ্টন অবৈধ হবে।
সন্তান না থাকলে স্ত্রী কত পায়?
উত্তর: সন্তান না থাকলে স্ত্রী পায় ১/৪ (এক-চতুর্থাংশ)। সন্তান থাকলে পায় ১/৮।
কন্যাসন্তান একাধিক হলে তারা কী পরিমাণ পায়?
উত্তর: যদি শুধু মেয়ে সন্তানেরাই থাকে (কোনো ছেলে না থাকে), এবং মেয়ের সংখ্যা একাধিক হয়—
তাহলে তারা যৌথভাবে ২/৩ (দুই-তৃতীয়াংশ) পাবে।
ফরায়েজ হিসাব ভুল হলে কি পরে সংশোধন করা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ। ওয়ারিশদের সম্মতিতে নতুন সঠিক হিসাব অনুযায়ী পুনরায় বণ্টন করা যায়।
বিরোধ দেখা দিলে সিভিল কোর্টে মামলা করে আদালতের মাধ্যমে সংশোধন করা যায়।
উপসংহার
ইসলামী উত্তরাধিকার বণ্টন—ন্যায়বিচার, ভারসাম্য ও পারিবারিক স্থিতির মূল চাবিকাঠি
ইসলামিক ফরায়েজ ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে পরিবারে ন্যায়বিচার, ভারসাম্য ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়। অধিকাংশ মানুষ ধারণা করেন যে উত্তরাধিকার বণ্টন শুধু পুরুষকে সুবিধা দেয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শরিয়াহ প্রতিটি ব্যক্তির অবস্থান, দায়িত্ব ও নিকটতার ভিত্তিতে অত্যন্ত নির্দিষ্ট ও সুবিবেচিত অংশ নির্ধারণ করেছে।
বাংলাদেশে ১৯৩৭ সালের শরিয়ত অ্যাপ্লিকেশন আইনের মাধ্যমে এসব নিয়ম রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত। তাই কোনো পরিবার চাইলে আইনগত ও ধর্মীয় ভিত্তিতে স্পষ্টভাবে, স্বচ্ছভাবে এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে সম্পত্তি বণ্টন করতে পারে।
সঠিকভাবে ফরায়েজ হিসাব নির্ণয় না করলে পরিবারে বিভক্তি, বিরোধ, মামলা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। অপরদিকে, শরিয়াহ অনুযায়ী উত্তরাধিকার বণ্টন করলে পারিবারিক শান্তি ও অধিকার সংরক্ষিত থাকে।
সুতরাং:
- মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টন একটি ধর্মীয় দায়িত্ব
- এটি আইনি বাধ্যবাধকতা
- সঠিকভাবে এটি পালন করার দায়িত্ব জীবিত প্রতিটি ওয়ারিশের ওপর বর্তায়
শরিয়াহভিত্তিক সঠিক বণ্টন আপনার পরিবারে ন্যায়, হক ও শান্তি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।